পিতার জন্ম হয়-এর একটি কবিতা ॥ সেলিম মল্লিক
স্বর্ণেন্দু সেনগুপ্তর কবিতার
বই নিয়ে মাঝে-মাঝেই পড়ি। পড়ি, কারণ, ওঁর কবিতার একটা ব্যাপার অনুধাবন করতে করতে আমার কাছে কবিতার বিশেষ এক
নির্মিতির ধারণা বেশ স্পষ্ট ফুটে ওঠে। যদিও নির্মিতির নিরিখে, শুধু ওঁর নয়, যে-কারুরই কবিতা পড়তে বসলে, শেষপর্যন্ত রসপিপাসা মিটতে পারে না। তবু, আজ ওঁর
কবিতার একটি নির্দিষ্ট নির্মাণের, তা না বলে, বলা ভালো, রচনাবুননের কথা বলব। আগে দু-একবার বলেছি,
স্বর্ণেন্দুর কবিতা বিষয়কে লিখতে চায় না, বিষয়ের
অন্তর্নিহিত অব্যক্তি এবং পারিপার্শ্বিকের ধারণা দিতে চায়। আর সেটা করতে গিয়ে একই
শব্দকে একাধিক দ্যোতনায় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে যেখানে আনেন স্বর্ণেন্দু, সেই সেই কবিতায় শব্দ ব্যবহারের এই আবর্তন অতি দৃষ্টিতে লক্ষ করবার। অনেক
ক্ষেত্রে এটা তাঁর বিশিষ্টতাও বটে। ‘পিতার জন্ম হয়’ বইতেই যেমন ‘বিকেল’, ‘ছায়া’,
‘সন্ধে’, ‘স্মৃতি’ ফিরে
ফিরে এসেছে, কিন্তু এসেছে ভিন্ন ভিন্ন অভিঘাতে, অথচ একটা আবর্তনকেই যেন সম্পূর্ণ করতে চাইছে। তাঁর কবিতার কেন্দ্রে বলবার
কথাটি মাকড়সার মতো বসে থাকে, আর চতুর্দিকে ছড়িয়ে রয় শব্দের
চতুরালি জাল, জালের ওই বিস্তারে পতঙ্গের মতো পাঠকের মন আটকে
পড়ে, তখনই টের পান পাঠক কেন্দ্রে মাকড়সারূপ অনশ্বর কবিতার
মৃদু নড়াচড়া। ওই বইয়ের একটি কবিতা [‘ভুলের মাহাত্ম্যগুলি’]
এই মর্মে পড়া যাক:
“ভুলের মাহাত্ম্যগুলি একইভাবে রয়ে গেছে
ক্রমরাত্রির কথা যেভাবে রয়েছে
চেতনার অনেক গভীরে
ভুলক্রম থেকে থেকে ভ্রমের
অনুপুঙ্খ হয়ে ওঠে
ভ্রম যেন ভ্রান্তির একপেশে ছায়া, সকালবেলায়
ভ্রান্তিগুলি রাত্রির, ভ্রান্তিগুলি রাত্রির রকমফের বোঝে
ছায়ার স্থাপত্য নিয়ে একটি নাটক,
অভিনয়ের আগে আগে শেষ হবে বলে
রচিত হয়েছে
রচনার ক্রম আছে, মানুষের ছায়াময়তা যেভাবে রয়েছে
পথের বিভ্রমগুলি শেষ হলে, এখনো মানুষ ছায়ার স্থাপত্যে মেতে ওঠে”
অন্য কিছু সেভাবে নয়, এখানে নির্দিষ্ট করে দেখব কীভাবে শব্দের অনুবর্তন কবিতাটিতে জাল বিছিয়েছে।
এই জাল হয়তো বিভ্রম। কবি তবু বিভ্রমের মাহাত্ম্যকেই যেন শুরুতে স্বীকার করে
নিয়েছেন। শিরোনামের মতোই কবিতাটির আরম্ভ ‘ভুল’ শব্দ দিয়ে। সংস্কৃত 'ভ্রম' হিন্দিতে
‘ভুল’, যার অর্থ ভ্রান্তি। আবার
ভুল+ভ্রান্তি একসঙ্গে জুড়ে দিলে হয় বিস্মৃতি। ‘চেতনার অনেক
গভীরে’ ‘স্মৃতি’র থাকবার কথা, কিন্তু এই কবিতায় যেন ‘বিস্মৃতি’-কেই সেখানে থাকতে দেখা যাচ্ছে। আসলে বিস্মৃতিও থাকে। কারণ, ভুলে যাই তো কতকিছু। আর ভুলে যাওয়া তো চেতনা-বহির্ভূত নয়, বরং সে চাঁদের ওপিঠের মতো চেতনারই আর-একটা দিকের সঞ্চয়। সভ্যতার ইতিহাস
বলে, মানুষ তার চেতনার শক্তিতে কতকিছুকেই ভুলে যেতে পেরেছে
বলেই-না বেঁচে থাকতে সমর্থ আজও।
দ্বিতীয় স্তবকের শুরুতেই আবার ‘ভুল’ শব্দটি ব্যবহৃত হল, এবার ‘ভুলক্রম’। একই চরণে, দুটো শব্দ পরে এল ‘ভ্রম’। পরের চরণে ‘ভ্রম’ এবং তার একটা শব্দ পরেই ‘ভ্রান্তি’। দ্বিতীয়
স্তবকের প্রথম চরণটি এরকম: “ভুলক্রম থেকে
থেকে ভ্রমের অনুপুঙ্খ হয়ে ওঠে”। ‘ভুলক্রম’
হল ‘ক্রম আবর্তমান ভুল’ আর
‘ভ্রম’ [ ভ্রম্ ] হল ভ্রমণের হেতু
ঘূর্ণি বা আবর্ত – এবং দুই-ই মায়ার জন্ম দেয়, যাকে ইংরেজিতে hallucination বলে, আর তা বাইরের কারণ ছাড়াও ঘটতে পারে। ওই যে চেতনার অনেক গভীরে ভুলের
মাহাত্ম্য রয়েছে, hallucination যেন তারই ক্রিয়ার ফল,
সেই বিস্মরণেরই রূপান্তরিত জাগরণ, তার জন্যেই
যেন ভ্রমণের হেতু ভ্রমরের মতো ঘুরে বেড়ানো। দ্বিতীয় স্তবকের দ্বিতীয় চরণে আছে,
“ভ্রম যেন ভ্রান্তির একপেশে ছায়া”। ‘ভ্রম’ যেমন hallucination-কে
বোঝায়, তেমনি ‘ভ্রান্তি’
delusion-কে ইঙ্গিত করে। মনে রাখতে হবে, hallucination মায়া, কিন্তু তার সঙ্গে প্রবঞ্চনার সম্পর্ক নেই,
delusion হল এমন এক মোহ, যার ভেতরে ছড়িয়ে রয়েছে
প্রবঞ্চনার প্রণোদনা। hallucination আর delusion মিলে যেন এই কবিতায় একটি ভ্রমণপথ তৈরি হয়েছে, যা শেষ
না হলে কবিতাটিকে পাওয়া সম্ভব নয়। এসেছে ‘নাটক’ ও ‘অভিনয়’-এর প্রসঙ্গও – নাটকে নর্তক এমন দেহভঙ্গিমার ভ্রম তৈরি করেন, যা
আসলে অভিনয়, আর অভিনয় তো বাস্তবতার সদৃশীকরণ, যেখানে ভ্রান্তির ভূমিকা ভূমির মতোই অনিবার্য। উল্লেখ্য, ‘ভ্রান্তি’ কাব্যের অর্থালংকার বিশেষও, যা “সৌসাদৃশ্য জানানোর জন্য সদৃশ গুণসম্পন্ন বস্তুতে
সদৃশ বস্তুর কাল্পনিক বা কবিপ্রৌঢ়োক্তিসিদ্ধ ভ্রম।“
আশ্চর্য! একটি কবিতা কীভাবে
ভুলের মাহাত্ম্যে নির্ভুলভাবে নিজেকে রচনা করে ফেলল।
...
এই কাব্যগ্রন্থটির একটি আলোচনা করেছিলেন কবি উজ্জ্বল সিংহ। আলোচনাটি প্রকাশিত হয়েছিল, শিলাদিত্য পত্রিকায়, ২০১৬-র নভেম্বর মাসে। আলোচনাটি পড়ুন এখানে।
...
এই কাব্যগ্রন্থের একটি আলোচনা প্রকাশিত হয়ে ছিল কবি মিতুল দত্ত সম্পাদিত ক্লোরোফিল ব্লগে। আলোচনা করেছিলেন কবি শৌভ চট্টোপাধ্যায়। আলোচনাটি পড়ুন এখানে।
...
কাব্যগ্রন্থটির একটি আলোচনা প্রকাশিত হয়েছিল, এখন শান্তিনিকেতন ওয়েব ম্যাগাজিনে। আলোচনা করেছিলেন কবি দীপ শেখর চক্রবর্তী। আলোচনাটি পড়ুন এখানে ।
...
কাব্যগ্রন্থটির একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা প্রকাশ করেছিল আনন্দবাজার পত্রিকা। আলোচনাটি পড়ুন এখানে।
...
বইটি সংগ্রহ করতে চাইলে ক্লিক করবেন এখানে।
বইটি সংগ্রহ করতে চাইলে ক্লিক করবেন এখানে।
No comments:
Post a Comment