প্রবন্ধ : স্বর্ণেন্দু সেনগুপ্ত ।
মাঝে মাঝে, কবিতা কীভাবে লেখে, এই নিয়ে
আমাদের মধ্যে একটা সংশয় তৈরি হয়। এই অবস্থার সম্মুখীন হলে, দীর্ঘদিন একজন কবি
কবিতা লেখা থেকে দূরে থাকেন, এক শূন্য অবস্থানে থাকেন। সেই সময় যদি কেউ
জানতে চায়, কেন লিখছেন না কবিতা, এর একটিই
বিশ্বাস যোগ্য উত্তর তখন তার কাছে থাকে, যে, তিনি কবিতা লিখতে
পারছেন না, বা কীভাবে লিখতে হয় কবিতা তা তিনি ভুলে গেছেন। কবি বীতশোক ভট্টাচার্যের
কাছে একবার জানতে চেয়েছিলাম, কেন কবিতা লেখা হয়, না লিখলেই বা ক্ষতি কী? মনে আছে, বীতশোকবাবু, রবীন্দ্রনাথ অনুসরণে বলেছিলেন, আমরা শুধু কবিতা লিখতে পারি, কবিতা পড়ে
আনন্দ পেতে পারি, আর কবিতার আলোচনা করতে পারি, এর বাইরে
কবিতা নিয়ে ভাবনার কিছু নেই। এর পরের প্রশ্নটি-ই অবধারিত ভাবে হওয়া উচিত, কীভাবে লেখা হয় কবিতা ? কিন্তু সে
প্রশ্ন সেদিন আর আমার করা হয়ে ওঠেনি। তবে এই না লিখতে পারার মাঝে, একটি বিষয়ে
নিশ্চিত হওয়া যায়, তা হল কবিতার অস্তিত্ব রয়েছে, কবিতা বলে একটি বিষয় আছে
নিশ্চিতভাবেই, না-হলে এই অপেক্ষা কিসের জন্য, এই না লিখতে পারার হতাশা কিসের জন্য
? যদি অবহেলায় লিখে ফেলা যেত একটি কবিতা, প্রতিদিনের জীবনে যেমন অবহেলায় অনেক
কিছুই আমরা করে ফেলি, তাহলে হয়ত তার আর আলাদা কোনো গুরুত্ব থাকতো না, চিরকালীনতা থাকতো
না আমাদের কাছে। লিখতে চাইছি অথচ পারছি না, এমন একটি মুহূর্তের সম্মুখীন হয়েই
বোধহয় কবিতা আমাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। চাইলেই যা পাওয়া যায় না, আর একবার পাওয়া
হয়ে গেলে তা আর হারাবে না, এই বিশ্বাস আমাদের কাছে যে পরমকে মূর্ত
করে তোলে, যে অনির্বচন কে বাচনিক করে তোলে তাই হয়তো কবিতা। এই না পারার মুহূর্তই
আসলে কবিতাকে টের পাওয়ার মুহূর্ত, তা যে আছে কোথাও অথচ ধরা যাচ্ছে না, সেই বোধ-ই
আসলে কবিতার অস্তিত্বকে প্রমাণ করে একজন কবিতাপ্রার্থীর কাছে। কবিতা কী, কাকেই বা
বলা হবে কবিতা এই গুরুত্বপূর্ণ অথচ অসহায় জিজ্ঞাস্যটির পেছনে অনেকানেক ব্যাখ্যা,
মতামত এবং অনেকানেক নীরবতার পরেও, এখন মনে হচ্ছে, কবিতার অস্তিত্ব সম্পর্কে এই নিঃশংসয়তার
বোধ বা উপলব্ধিটি জরুরি। যাকে কামনা করছি, আগে তাকে বিশ্বাস করতে
হবে, স্বীকার করতে হবে। কিন্তু কবিতার থেকেও খ্যাতি বা
জনপ্রিয়তার প্রতি ঝোঁকটা যখন বেশি হয়, তার পরিণতি কতটা অগভীর, কতটা হাস্যকর হয়ে
ওঠে তা তো প্রতিনিয়তই দেখতে পাওয়া যায়। কীভাবে লেখা হয় একটি কবিতা? এই প্রশ্নটির
সদুত্তর পাওয়ার ইচ্ছে থাকে, অন্তত পেতে পারলে নিশ্চিত ভাবেই বলে দেওয়া যায় যে এবার
হয়তো সহজেই ধরে ফেলতে পারব সেই কাঙ্খিতকে, এবার থেকে হয়তো আর অনেক অনেক বন্ধ্যা
মূহুর্ত কাটাতে হবে না, কিংবা আর হয়তো কোনোদিন
লিখতে পারব না — এ ধরনের অসহায় কোনো ভাবনা কখনো গ্রাস করবে না একজন কবিকে।
কবি নারায়ণ
মুখোপাধ্যায় একবার বলেছিলেন, যে, খাতা কলম
খুলে বসলেই তাঁর লেখা আসে। এরজন্য কোনো রকম প্রেরণা বা তেমন কোনোকিছুর দরকার হয় না
তাঁর। কখন ধরা দেবে সেই অমোঘ পঙক্তিটি, তারপর ক্রমে সম্পূর্ণ কবিতাটি, এটিও তাঁর
চিন্তার বিষয় হয়ে ওঠে নি কখনো! কীভাবে আসত তাঁর কাছে একটি লেখা, কী ছিল তাঁর সেই বিস্ময়কর পদ্ধতি, যেহেতু দূরভাষে কথা
হচ্ছিল আমাদের, সেদিন আর জানা হয়ে ওঠেনি। বাস্তব একটি চরিত্রকে কীভাবে উপন্যাসের
চরিত্রে রূপান্তরিত করেন তিনি, এমন একটি প্রশ্ন একবার হেমিংওয়েকে করা হয়েছিল। একজন
ঔপন্যাসিকের কাছে, এই চরিত্র সৃষ্টির পদ্ধতি আসলে অনেকটাই তার
লিখনপদ্ধতি। হেমিংওয়ে বলেছিলেন, তা যদি বলা হয় তাহলে মানহানির মামলার
আইনজীবীর জন্য আস্ত একটি বই লেখা হয়ে যাবে সহজেই! বুড়োলোক ও একটি সমুদ্র-এর
লেখক কবি ছিলেন না, কেউ কেউ তাঁর গদ্যের প্রকরণের মধ্যে কবিত্ব খুঁজে নিতে পারেন হয়তো,
তা এখানে আলোচনার বিষয় না হলেও এটি বুঝে নেওয়া যায় যে, একজন
গদ্যশিল্পী হয়তো বলতে পারেন কীভাবে লেখেন তিনি, কেমন তার
সৃজনপ্রক্রিয়া। হেমিংওয়ে অন্তত তাই বোঝাতে চাইলেন একজন পাঠককে, তবে যে ভাষায় তিনি
তা ব্যক্ত করলেন, তাও আর এক রকমের সন্ধ্যাভাষা-ই! আর একজন গদ্যশিল্পী, ওরহান
পামুক, তিনি কেন কবিতা লেখেন না জানতে চাওয়া হলে বলেছিলেন, যে, তিনি বিশ্বাস করেন একজন কবির মধ্য দিয়ে
ঈশ্বর কথা বলেন, এবং কিছুকাল কবিতা লেখার চেষ্টা করার পর তিনি আর সেই চেষ্টা
করেননি, কারণ এটি অনুভব করেছিলেন যে তাঁর মধ্য দিয়ে ঈশ্বর কথা বলছেন না। এই
বক্তব্যের প্রেক্ষিতে, আমরা যদি কবিতাকে এক ঐশ্বরিক বিষয় বলে ভেবে নিই, তাহলে কোনো ভুল হবে না বোধহয়। ঈশ্বর আছে কি নেই
সে প্রশ্ন এখানে অপ্রাসঙ্গিক, কিন্তু আমাদের বিশ্বাসের (বা অবিশ্বাসের) একটি বিশেষ
স্তর যেখানে ঈশ্বরের ধারণাটি মূর্ত হয়ে আছে সেই বিশ্বাসের প্রেক্ষিতটি বাস্তব। কবিতার
সাক্ষাৎ পাওয়া ও ঈশ্বরের সাক্ষাৎ পাওয়ার মধ্যে বোধহয় কোনো তফাৎ রাখতে চাইলেন না
এখানে, ওরহান পামুক। কবি আলোক সরকার, এক সাক্ষাৎকারে, তাঁর কাব্যভুবন
সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছিলেন, তাঁর সব
চেষ্টা আসলে ঈশ্বরের ভুবনের পাশাপাশি আর একটা দ্বিতীয় ভুবন গড়ে তোলা। দেখা যাচ্ছে,
কবিকে ঈশ্বরপ্রতিম হয়ে উঠতে হবে, নাহলে তিনি সৃষ্টি করবেন কীভাবে, দ্বিতীয় ভুবন
রচনা করবেন কীভাবে? এমনও একটি ধারণার কথা শোনা যায়, অনুভবের স্তরে যে কবিতাটি
রয়েছে তাই হল প্রকৃত কবিতা, যখন তা বর্ণে ছন্দে লিপিবদ্ধ করা হচ্ছে তখনই আসলে
কবিতাটির বিনাশ ঘটছে, পবিত্রতা নষ্ট হচ্ছে। এই ধরনের ভাবনা আসলে আর এক অর্থে সেই
ঐশ্বরিকতা কেই সমর্থন করে। সেন্ট অগাস্টাইনকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আপনি ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন? অগাস্টাইন বলেছিলেন, হ্যাঁ আমি
ঈশ্বরে বিশ্বাস করি। এরপরেই তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আপনি ঈশ্বর দর্শন করেছেন?
অগাস্টাইন তৎক্ষণাৎ উত্তর দিয়েছিলেন, না আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করিনা! এই কথোপকথনটির
যিনি শ্রোতা বা পাঠক তিনি হয়তো সেই কাঙ্খিত কবিতার দেখা পেয়ে যেতে পারেন এখানেই, এই
গভীর দর্শন সঞ্জাত উপলব্ধির সম্মুখীন হয়ে। অবশ্য তা যদি নাও হয়, অন্তত এই সত্যটি তিনি
উপলব্ধি করবেন যে, ঈশ্বরের মতো কবিতাও আসলে নিভৃত, নীরব অনুভবের একটি বস্তু তাকে
ব্যাখ্যা করার সমুহ প্রচেষ্টা-ই আসলে তাকে নষ্ট করার জন্য এক-একটি দারুণ প্রয়াস!
একজন কবি কি
বলতে পারেন, যে, কীভাবে লেখেন তিনি? তাহলে হয়তো, না লিখতে পারাটাকেও বুঝে নেওয়া যেত, অন্তত নিরেট একটা কারণ খুঁজে পাওয়া যেত, এই না লিখতে পারার! কেন লিখি এই নিয়ে অনেকেই অনেক কিছু বলেছেন। কিন্তু
কীভাবে লিখি? একজন কবি কেন কখনো লিপিবদ্ধ করে রাখতে চান না তার সৃজন পদ্ধতির
ইতিহাসটিকে, না, চাইলেও এই উপলব্ধিটিকে এই অভিজ্ঞতাটিকে ব্যাখ্যাযোগ্য করে তুলতে
পারেন না তিনি? কীভাবে লিখি এবং কেন লিখি আসলে এই দুটি বিষয়-ই, সেদিক থেকে ভাবলে, কোনো
ব্যাখ্যাযোগ্য উপলব্ধি দ্বারা প্রকাশ করা সম্ভব নয়! কেন একজন লেখক লেখেন, এমন
কৌতূহলের দ্বারা আক্রান্ত কোনো পাঠকের প্রিমো লিভি নামে সেই ইতালীয় লেখকের কথা মনে
পড়তে পারে, যিনি এ বিষয়ে, খুঁজে খুঁজে নয়টি কারণ নির্দেশ করেছিলেন তাঁর ‘হোয়াই ডাজ
ওয়ান রাইট’ নিবন্ধটিতে। তাঁর নির্দেশিত কারণগুলি হল— প্রেরণার
বশবর্তী হওয়া, নিজেকে ও অপরকে তৃপ্তি দেওয়া, অপরকে সমৃদ্ধ করা, বিশ্বের উন্নতিসাধন
করা, নিজের ভাবনাগুলি অপরকে জানানো, ব্যক্তিগত ব্যথা-বেদনা থেকে মুক্তিলাভ,
বিখ্যাত হওয়ার ইচ্ছে, সম্ভ্রান্ত হওয়ার ইচ্ছে, অভ্যেসের বশবর্তী হওয়া। সন্দীপন
চট্টোপাধ্যায়, নিজে সারাজীবন গদ্য লিখলেও কবিতার প্রতি চিরকালীন পক্ষপাতিত্ব যাঁর
গদ্যভাষাতেই খুঁজে পাওয়া যায়, তিনি ‘জীবনানন্দের গদ্য এবং তারপর’ নিবন্ধে প্রিমো
লিভির এই লেখাটির প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন। সেখানে লেখক সন্দীপন তাঁর অননুকরণীয় ভঙ্গিতে বলেছেন, “ এই সেই ১১টি কারণ, যে-জন্যে লেখকরা লেখেন না।
যেমন ধরুন, জীবনানন্দ দাশ — মৃত্যুর পর জানা গেল, এক ট্রাঙ্ক-ভর্তি গল্প-উপন্যাসের কথা। কেন লিখে রেখেছিলেন? জীবনানন্দের
উত্তর নিশ্চয় একটা : জানি না।” প্রিমো লিভির দেখানো ন’টি
কারণকে, হয়তো সাময়িক বিভ্রান্তিতে, সন্দীপন এগারোটি কারণ বলে উল্লেখ করেছেন এখানে।
যাই হোক, লেখার পদ্ধতির সঙ্গে লেখার কারণটিও যে রহস্যময় এই ধরনের আলোচনাগুলির
সম্মুখীন হলে সে ধারণাটি আরো বেশি করে স্পষ্টতা পেয়ে যায় আসলে। যদিও, আপনি কেন লেখেন,
এমন একটি প্রশ্ন কবি শঙ্করনাথ চক্রবর্তী-কে করা হলে, তিনি অকপটে উত্তর দেন, ‘জীবনকে
সহনশীল করে তোলার জন্য’। অনেক বিতর্কের মাঝে, আমার কাছে কবি শঙ্করনাথের এই উপলব্ধি,
আমার পাঠ অভিজ্ঞতায়, এখনো পর্যন্ত শ্রেষ্ঠ সংযোজন
বলেই মনে হয়েছে।
অমিত্রসূদন
ভট্টাচার্য রচিত ‘রবীন্দ্রনাথ কেমন করে লিখতেন’ বইটি হাতে আসার পর মনে হয়েছিল
দীর্ঘদিন লালিত এই জিজ্ঞাস্যের একটি অনায়াস সমাধান এইবার হয়তো খুঁজে নেওয়া যাবে
সহজেই। কিন্তু দেখা গেল যে, অমিত্রসূদন বাবু, কেমন করে লিখতেন রবীন্দ্রনাথ, এই জিজ্ঞাস্যটির
সমাধান খুঁজতে গিয়ে, কখন লিখতেন রবীন্দ্রনাথ, কোথায় লিখতেন রবীন্দ্রনাথ, কোন
কোম্পানীর ডায়েরিতে লিখতেন তিনি, কারাই বা কবিকে সেগুলি উপহার দিতেন ইত্যাদি অনেক
অজানা বিষয়ের হদিশ খুঁজে পেয়েছেন এবং পাঠককে জানিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ প্রথম জীবনে
শ্লেট পেনসিলে কবিতা লিখেছেন, একজন পাঠক জেনে হয়তো অবাক হবেন। একসময় কিশোর
রবীন্দ্রনাথ ভেবেছিলেন ফুলের রস মাড়াই করে সেই রস দিয়ে কবিতা লিখবেন, যদিও সফল
হননি, কিংবা ‘কবি-কাহিনী’ কাব্যগ্রন্থটি রচনা করতে কবির সাকুল্যে আট দিন সময়
লেগেছিল— এমন সব বিষয় রবি-অনুরাগী পাঠকের মধ্যে বিস্ময়ের উদ্রেক করবে
নিশ্চিতভাবেই। রবীন্দ্রনাথের লেখালিখির সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ের অবতারণা
করা হয়েছে বইটিতে প্রামাণ্য তথ্য সহযোগে, কিন্তু এ গ্রন্থটি পাঠ করে, রবীন্দ্রনাথ
কীভাবে বা কেমন করে লিখতেন, এর মতো একটি আপাত কুয়াশাচ্ছন্ন
জিজ্ঞাস্যের সমাধানে পৌঁছনো একজন পাঠকের কাছে খুব সহজসাধ্য হয়ে উঠবে না শেষপর্যন্ত,
এটিও ঠিক। ফলে কিছুতেই আর আমাদের জানা সম্ভব হলো না, কী সেই অন্তর্গত রসায়ন যা
রবীন্দ্রনাথকে সারা জীবন লিখিয়ে নিতে পেরেছিল, ক্লান্তিহীন! জানা সম্ভব হল না, কী
সেই অমোঘ পদ্ধতি যা রপ্ত করে নিতে পারলেই একজন কবিকে আর ‘কবিতারোহিত’
সময় অতিবাহিত করতে হবে না কোনোভাবেই।
পূর্বে
উল্লেখিত কবি আলোক সরকারের সাক্ষাৎকার থেকেই এই ‘কবিতারোহিত’ শব্দবন্ধটি আহৃত
হয়েছে। তিনি এ সাক্ষাৎকারের একজায়গায় বলেছেন কবিতারোহিত কবিকৃতিহীন জীবন যাপন
তাঁকে করতে হয়নি। এই কথা কটি কবি নারায়ণ মুখোপাধ্যায়ের প্রসঙ্গেও হয়তো সত্য।
কিন্তু এর বিপ্রতীপেও অনেকে অবস্থান করেন, দীর্ঘ, অতি দীর্ঘ সময় তাদের কাটাতে হয় কবিতারোহিত,
কবিকৃতিহীন। এই বন্ধ্যাসময়ের মধ্যদিয়ে যাওয়া একজন কবির সাময়িক মনে হতেই পারে,
এ-জীবনে আর হয়তো একটিও কবিতা লেখা সম্ভব হবে না তার দ্বারা। ক্রমে এই বন্ধ্যা সময়
কেটেও ওঠে একদিন এবং এই আসা-যাওয়ার খেলাটাই একজন কবিকে জাগিয়ে রাখে জীবনভর।
কবিতা
কীভাবে লেখা হয় সে প্রশ্ন অনেক দূর, কবিতা কাকে বলা হয় এমন প্রশ্নের অস্তিত্বকেই
অনেকে স্বীকার করে নিতে রাজি নয় একেবারেই। তারা মনে করেন যে, কবিতাকে কোনো একটি
নির্দিষ্ট সংজ্ঞায় ধরা যায় না, এবং এটিও ঠিক ভিন্ন ভিন্ন কবির কবিতা বোধ ভিন্ন
ভিন্ন হয়। একজন কবির কবিতা বোধ অপর একজন কবির কবিতা রচনায় সহযোগী হলে অবশ্যই তা
সুখের কথা, কিন্তু যদি তা ন্যুনতমও উপকারে না আসে তাহলেও তা ক্ষতির কিছু নয়। এখানে
উপযোগিতার সাপেক্ষে, একজন অপরজনের কাছে মূল্যহীন মনে হতে পারে, তারপরও দুজন-ই আসলে
বিরাট কবিতা-বিশ্বে সমান মূল্যের অধিকারী। এ প্রসঙ্গে, নেহাত কৌতূহলের বশে, বীতশোক
ভট্টাচার্য রচিত ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অভিধান’ গ্রন্থটির কথা একজন কবিতাপাঠকের
মনে পড়তে পারে। কবিতা কেন্দ্রিক দুটি বিষয় এ অভিধানে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। সে দুটি
হল, ‘কবিতা’ এবং ‘কবিতা সংকলন’। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, কবিতা শিরোনামে
এখানে যে বিষয়টি আলোচিত হয়েছে, তা আমাদের আলোচিত কবিতা নয়, বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত
একটি পত্রিকা : কবিতা। বীতশোক ভট্টাচার্যের পরিচয় বাঙালি সারস্বত সমাজে একজন
অভিধান রচয়িতা হিসেবে নয়, তিনি প্রথমত একজন কবি। নিজে একজন কবি হয়েও, বীতশোক
ভট্টাচার্য কবিতার কোনোরকম সংজ্ঞা বা ব্যাখ্যা থেকে নিজেকে বিরত রাখলেন কেন,
প্রশ্নের এই বিস্ময়টিকেও এই অভিধান একজন পাঠকের কাছে তুলে ধরে, অন্য কোনো রচয়িতার
অভিধানে সে সুযোগ নেই। বীতশোক ভট্টাচার্য আসলে কোন ধারণাটির পক্ষে থাকতে চাইলেন — কবিতা ইত্যাদি বিষয়ের কোনো সার্বজনীন সংজ্ঞা হয় না, না অন্য
একটি ধারণা, কবিতা বিষয়ক কোনো একক ব্যক্তির চিন্তা-ভাবনা অপরের
কাছে কোনো বিশেষ মূল্য নির্ধারণ করে দেয় না? এতসবের পরেও কবি রচনা করেন, কবিতা
রচিত হতে থাকে। কোনো এক অ-পূর্বনির্ধারিত কারণে একজন কবি হয়ে ওঠেন এবং জীবনের
সমান্তরালে কবিতা–কে স্থান করে দেন। এখন মার্কিন কবি, জর্জ অপেনের সে কথাটিই শেষ
পর্যন্ত আমাদের মনে থাকে যে, কবিতা লিখতে একবার শিখে যাওয়ার পর, একজন চাইলেও তা আর
ভুলতে পারবে না।
***