লেখা / অলঙ্করণ : স্বর্ণেন্দু সেনগুপ্ত ।
সে উঠে পড়ল। সে বসল। আবার উঠল। এভাবে আর কতবার জানা যায় নি। কিন্তু গাছটি গাছের জায়গায় স্থির। পাতাগুলি পাতার জায়গায়। লোকটি গাছের থেকে একটু দূরে সরে এসে, নিজের ছায়াকে দেখল। রোদ উঠেছে। ছায়া দেখা যাচ্ছে।
কতগুলো পাখি, আরও অনেকগুলো পাখির সঙ্গে উড়ে গেল। লোকটি দেখল। হাসি পেল, অথবা মৃদু একটু হাসি টের পেল লোকটি। লোকটি আসলে হাসতে চেয়েছিল। সেই হাসিতে ফেটে পড়ার মতো করে হাসি। পাখার সমবেত শব্দের তালে তাল মিলিয়ে হাসি। কিন্তু শেষপর্যন্ত মৃদু হাসিই এল তার। সে দেখল মাথার ওপর দিয়ে অনেকগুলো পাখি যখন, আরও অনেকগুলো পাখির সঙ্গে উড়ে যাচ্ছে যখন, তার মৃদু হাসি। পাখি ওড়াটা তেমন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু বিষয় হয়ে উঠল। পাখি ওড়ার সঙ্গে লোকটির হাসি জুড়ে গেল। যেন একটির জন্য আর একটি। একটি সিকোয়েন্স! লোকটি আবার বসল। গাছের তলায়। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ফলগুলি, বটফল। লোকটির বসে থাকা জুড়ে একটি বটগাছ। লোকটি উঠে দাঁড়াল।
একটি বিষয় এভাবেই আর একটি বিষয়কে স্পষ্টতা দিচ্ছে। একটি সকাল গড়িয়ে যাচ্ছে দুপুরের দিকে। দুপুর স্পষ্টতা পাচ্ছে। ঘটনার ঘনঘটা। কিন্তু ঘটনা কই? নতুন কিছুই ঘটছে না। ঘটনার পুনরাভিনয় হচ্ছে। একইভাবে ঘটে চলেছে সবকিছু। অনাদিঅনন্তকাল। লোকটি সেই ঘটমানতার সঙ্গে মিশে যেতে চাইছে। বসছে, উঠে পড়ছে, আবার বসছে। এইভাবে কতবার জানা নেই। মজা লাগছে। বেদম মজা। সেই হাড়হারামি মজা। সেইজন্যই হাসি। পাখি ওড়াটা বিষয় নয়, তবু পাখি ওড়া।
আসলে মুক্তি খুঁজছে। সে বসে পড়ছে। এই হাড়হারামির কাছ থেকে মুক্তি। সে উঠে পড়ছে। হাঁপিয়ে উঠতে চাইছে একপ্রকার। সে বসছে। একেবারে মজ্জায় মজ্জায় হাঁপিয়ে ওঠা যাকে বলে। সে উঠে পড়ছে। সামনেই সেই পানের স্টল। চিরকাল। করুণাময়ী পানস্টল। এই নামটা কতবার পড়েছে সে? আরও কতবার পড়তে হবে? ভিতরের সেই মেয়েমানুষটি, কী নাম তার ? নাম জেনে কী লাভ! কলেজে পড়তে পড়তেই একজনের সঙ্গে উধাও। অষ্টমঙ্গলা না পেরোতেই, বিয়ের সব চিহ্ন ধুয়েমুছে দিয়ে, পৈত্রিক পানদোকানটায় থিতু হওয়া। না, আর কলেজে ফেরা হয়নি। এখানে মিঠেপাতা পাওয়া যায়। শাদা চুন বুলিয়ে নিজেই লিখে দিয়েছিল করুণাময়ীর দেওয়ালে। যদিও, এই এলাকায় কেউ কোনোদিন মিঠেপাতার খোঁজ করে না! এই বিজ্ঞাপনটি কতবার পড়েছে সে? আরও কতবার পড়তে হবে? অসহ্য। সে বসে পড়ে। শালা, সেই মজা। হাড়হারামি বজ্জাত।
বামদিকের রাস্তাটি ধরল লোকটি। রাস্তাটি সোজা স্টেশনে গিয়ে উঠেছে। লোকটি এগিয়ে গেল স্টেশনের দিকে। কিন্তু ঘটনা কিছু ঘটল না। একটি ঘটমানতা থেকে আর একটি ঘটমানতায় ঢুকে গেল সে। কতবার গিয়েছে এই রাস্তা ধরে, স্টেশনমুখি? আজ আরও একবার। যেতে যেতে লোকটি হঠাৎ পেছন ফিরল। বটগাছটির দিকে, যেখানে সে ছিল এতক্ষণ,সেই বটগাছটির দিকে ফিরে দাঁড়াল। এবার পেছন ফিরে স্টেশনের দিকে হাঁটতে শুরু করল। আসলে পিছিয়ে যেতে লাগল লোকটি। এইভাবে পিছিয়ে যেতে যেতে সে এগিয়ে যাচ্ছে। আবার বেদম জোরে হাসি পাচ্ছে তার। হাসি পেলেও গম্ভীর মুখে সে পিছিয়ে যেতে লাগল। এতদিন গন্তব্যকে সামনে এগিয়ে আসতে দিয়েছে সে, এবার শুরুর স্থানটি, বলা ভাল প্রস্থানবিন্দুটির ক্রমশ দূরে সরে যাওয়া দেখতে চাইল লোকটি। বটগাছটি দূরে সরে যাচ্ছে। লোকটি দেখছে। সেই হাড়হারামি মজাটা আবার চিনচিন করে কেঁপে কেঁপে উঠছে নিজের ভিতরে লোকটি টের পাচ্ছে। লোকটি যত টের পাচ্ছে, সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বটগাছটি তত পেছনের দিকে সরে সরে যাচ্ছে। এইভাবেই চলত, কতক্ষণ চলত, আমরা জানি না, যদি না একটি হাত এসে লোকটিকে পেছনদিক থেকে জোর করে থামিয়ে দিত। যার হাত সে স্টেশনের দিক থেকেই আসছিল। লোকটি তাকে চেনে, শালা সবদিন সেই এক পাজামা পাঞ্জাবি, এমনকি রঙটিও এক। অথচ পাজামাপাঞ্জাবিধারীর নামটি মনে করতে পারছে না লোকটি। ভালই হয়েছে, নামটি মনে পড়তেই হবে, এমন কী আর মানে আছে। বরং, এতক্ষণ না হাসা হাসিটি, লোকটি এবার হাসল।
— কী ভাবছেন, সন্ত্রাসবিদ্ধস্তবাবু ?
লোকটি আবার হাসল। একখানি মোক্ষম নাম দিয়ে দিয়েছে বলে মনে হোল তার। সেই এক পুরানো নামে আর কতবার ডাকা যায়!
— হ্যাঁ, সন্ত্রাসের কথা বলছেন? তা যা দিনকাল পড়েছে, ঠিকই বলেছেন। কিন্তু দাদা, আপনি পেছনদিকে মুখ করে হাঁটছিলেন কেন?
— ঐ যে করুণাময়ী পান স্টল, জানেন না ? এখানে চিরকাল মিঠেপাতা পাওয়া যায় ...
— মানে ? বুঝতে পারলাম না তো ?
— বুঝতে হবে কেন ? সবদিন সবকিছুই তো বুঝছেন দাদা, এবার একটু না হয় না বুঝলেন!
— না আপনার পেছন দিকে হাঁটার সঙ্গে পানগুমটির কী সম্পর্ক ?
— আপনি পাজামা পাঞ্জাবির বাইরে কিছু ভাবতে পারেন না, ঠিক ধরেছি ?
সন্ত্রাসবিদ্ধস্তবাবু অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে দেখে লোকটি আবার বটগাছ থেকে ক্রমশ দূরে সরে যেতে থাকে। মাথার ওপর, কতগুলি পাখি, আরও অনেকগুলি পাখির সঙ্গে মিশে গিয়ে ঘটনার মধ্যে চলে আসতে চাইছে দেখা যায়। যদিও, ঘটনার মধ্যে চলে আসাটা অতটা সহজ বিষয় নয় আর। লোকটি এক হাড়বজ্জাত মজার গুষ্টিশ্রাদ্ধ করতে করতে, বেদম হাসির পরিবর্তে গম্ভীর মুখে, ক্রমশ পেছন দিকে এগিয়ে যেতে থাকে।
২.
সকালবেলায়, কলেজমাঠে, মর্নিংওয়ার্কে এসে সে পেছন দিকে হাঁটা অভ্যেস করতে থাকে। লোকটি ক্রমে পেছন দিকে হাঁটা রপ্ত করে ফেলে। এইভাবে দেখে, একদিন, সে কোনোরকম বাধাবন্ধকতাহীনভাবে পেছনদিকে হাঁটতে পেরে যায়। ক্রমে সবাই জেনে যায়, যে, লোকটি পেছনদিকেই হাঁটে। সে যখন রাস্তা দিয়ে যায়, প্রত্যেকে সরে দাঁড়ায়। প্রথম প্রথম, এমন কি মর্নিংওয়ার্কের সময়েও, সবাই তার দিকে তাকাত, মুখ টিপে হাসত। সবার হাসি দেখে প্রাথমিকভাবে তারও যে হাসি পেত না, এমন নয়। সেও সজোর হাসিতে ফেটে পড়তে চায়। কিন্তু, হাসি পেলে সে গম্ভীর থাকার অভ্যেসটিও ক্রমে রপ্ত করতে শুরু করেছে। সবাই যখন তার দিকে তাকায়, হাসে, সেও সবার দিকে তাকাতে শুরু করে। এর ফলে হয় কী, তাড়াতাড়ি সবাই তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে থাকে। কেউ হাসে না। শুধু মাত্র যারা নিয়মিত লাফিং ক্লাবে আসে, প্রতিদিন সকালে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে, হাত দুটিকে কানের সামনে দিয়ে আকাশের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বানানো হাসির প্রদর্শনে মেতে ওঠে, তারাই কেবল গম্ভীর থাকে। তাদের হাসি পায় না। অনেক মানুষের মাঝে সে যে একটু আলাদা, সেটি আর খেয়াল থাকে না অনেক মানুষের। তার অপরগুলি, তার অন্যগুলি আসলে তার-ই নিজস্ব ব্যাপার হয়ে রয়ে যায়। সে দ্রুত তার নিজের একটি পৃথিবী গড়ে নিতে সক্ষম হয়। সেখানে, সবকিছুই তার নিজের মতো। অনেকের মাঝে গড়ে নেওয়া নিজের একটি জগত।
আর এইভাবে পেছনের দিকে হাঁটতে হাঁটতে লোকটি, শহরের বড় বড় বাড়িগুলির, প্রতিষ্ঠানগুলির, অফিস আদালতগুলির পেছনের দরজায় এসে পৌঁছে যেতে থাকে। সে আস্তে আস্তে সামনের দরজাগুলি ভুলে যেতে থাকে। অথচ, পেছনের দরজাটি তাকে খুঁজে নিতে হয় না। সে এই ব্যাপারটি আগে জানত না। একটি আবিষ্কারের আনন্দ তাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরতে চায়। সে আবার সেই হাড়বজ্জাত মজাটিকে টের পেতে থাকে। এই মজাটির একটি তুলনা লোকটি এতদিনে খুঁজে পেয়েছে। এই মজাটিই আসলে করুণাময়ী পানস্টল। চিরকাল একইরকম থেকে গেল। তুমি তার কাছে যাও আর নাই যাও, সে কিন্তু রয়েছে। আর ভিতরে সদাসর্বদা দাঁড়িয়ে রয়েছে সেই মেয়েমানুষটি। তার নাম কেউ জানে না, জানার দরকার পড়ে না। প্রত্যেকেই এসে, খুব নরম স্বরে বলে— এই একটা পান দিবি—
— ট্রেন আজ লেট আছে না ? সে প্রত্যেকের কাছেই এটা জানতে চায়।
— কবে আর রাইট টাইমে থাকে, বল! প্রত্যেকেই তাকে এই উত্তরটা দেয়, খুব নরম গলায়।
তার নাম কেউ জানে না। চিকন ও সুন্দর হাতদুটি থেকে বেরিয়ে এসেছে আঙুলগুলি। সেগুলির রঙ, শাদা ও খয়েরি মিলে, অন্য একটি রঙ হয়ে গেছে। সবসময় আঙুলগুলি চলছে। কাউকে কোনোদিন সেও জিজ্ঞেস করে না, কী পান লাগবে! পৃথিবীর সবাই, কে কী পান খায়, তার জানা আছে। শুধু এসে দাঁড়ানোর অপেক্ষা, সে জিজ্ঞেস করে, ট্রেন লেট আছে কিনা। আসলে জিজ্ঞেস করে না। সে কোনো একটা কথা দিয়ে শুরু করতে চায়। কিন্তু কেউ সেটা ধরতে পারে না। সবাই ওকে জানিয়ে দিয়ে যায়, ট্রেন কোনোদিন সময়ে আসে না। সে পানটি এগিয়ে দেয়। মুখে সুন্দর একটি হাসির প্রলেপ লেগে থাকে। হাসির মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আসে শাদা ও শাশ্বত বত্রিশটি দাঁত। কেউ কোনোদিন গুণে দেখল না। তবু, ওখানে যে বত্রিশটি-ই আছে সবাই নিশ্চিত। কোনো কোনো অতি উৎসাহী, ট্রেন লেট থাকার বাড়তি সময়টুকু ঠাহর করে নিয়ে, তাকে বলে যায়—খালি খালি দাঁত দেখাস না তো ছুঁড়ি। সকাল নেই সন্ধে নেই বত্রিশ খানা দেখিয়ে দিলেই হোল আর কি!
ঘটনা একইভাবে ঘটতে থাকে। পুনরাভিনয় হয়। এটাই আসলে মজা। মজার আর অন্য কি তুলনা হতে পারে, করুণাময়ী পান স্টল ছাড়া? লোকটি পেছনে আরও পেছনে এগিয়ে যেতে থাকে!
৩.
যে কোনো পেছনের দরজায় খুব দ্রুত পৌঁছে যায় লোকটি। এতই দ্রুত যে, সামনের দরজা দিয়ে যারা যায়, তারা লোকটির থেকে অনেক পেছনে পড়ে থাকে। অথচ তাকে এই নিয়ে কেউ প্রশ্ন করেনা। এখন সে বাড়িটিকে কত মিনিট সামনে ফেলে গেলে পেছনের স্টেশনে পৌঁছানো যায়, হিসেবগুলো এইভাবে করে। ফলে, সে খুব সহজে স্কুলকলেজঅফিসআদালতহসপিটালে পৌঁছে যেতে পারে। এগুলির বাইরেও একটি প্রতিষ্ঠান রয়ে গেছে। পার্টিঅফিস। এই পদ্ধতিতে সেখানে পৌঁছান সহজ হয়না। ক্ষমতার হস্তান্তর হয়, পার্টি অফিস বদলে যায়। আজ যেখানে স্বাস্থ্যকেন্দ্র, কাল সেখানে পার্টিঅফিস। লোকটির চোখের সামনে, রাতারাতি একটি পার্টিঅফিস গড়ে উঠল, সেখানে ছোট একটি পার্ক ছিল। পৌঁছানো সহজ হয় না। তার অবশ্য দরকারও হয় না। সে পেছনের দরজাগুলি জানে। সেখানেই দেখা পেয়ে যায় পার্টিঅফিসবাবুদের। তারা অবশ্য লোকটিকে দেখে না। বলা ভাল, দেখেও দেখে না। পেছন দিকে হাঁটতে পারা লোকটির আলাদা কোনো মূল্য নির্ধারিত হয়নি তাদের কাছে। আলাদা কোনো তাৎপর্য। কারণ, কোনো মিছিল আজ পর্যন্ত পেছন দিকে যায়নি। আর এমনিতে পিছুহটা ব্যাপারটিকে এরা প্রকাশ্যে স্বীকার করতে চায়না। পেছনদিকে হাঁটা একপ্রকার পিছুহটা-ই এদের কাছে। অলক্ষ্মণের চিহ্ন। তাই সবাই লোকটির দিক থেকে পেছন ফিরেছে। লোকটি এদিক থেকে অনেকটা নিশ্চিত। কোনো পার্টি-ই চাঁদা চায়না। কোনো পার্টির মিটিং-মিছিলে যেতে হয়না। শুধু দেখেছে, এরা রাস্তা ছেড়ে দেয় না। পেছন থেকে কারও সঙ্গে ধাক্কা লাগলে, লোকটি নিশ্চিত, সে কোনো পার্টিঅফিসবাবু। এরা রাস্তা আগলে রাখে। কেউ যেন এগিয়ে যেতে না পারে। পারলে সমাজ টাকেও থামিয়ে দেয়। অন্যরা পাশ কাটিয়ে চলে যায়, বা যাওয়ার আগে সৌজন্যের হাসি বিনিময় করে যায়। এগুলির কোনোটাই, পেছন থেকে, এই লোকটির ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না। ধাক্কা অবধারিত। এদের কথা ভেবেই, হাঁটার গতিটা কিছুটা কমিয়ে এনেছে লোকটি। ধাক্কা দিতে দিতে লোকটি বুঝেছে, বেশীরভাগ সময়েই এরা মদ্যপ অবস্থায় থাকে। অজানা বিপদের কথা ভেবে, সে তার হাঁটার গতি কমিয়ে এনেছে। এরা এদের মদ্যপানের মতো রাগটিকেও গোপন করে। পেছনদিকে যেতে যেতে হঠাৎ একটি হাতের ধাক্কা টের পায় লোকটি, পেছন না ঘুরেই জানতে চায়—
— শিক্ষানুরাগীবাবু নিশ্চয় !
— হে... হে... । আপনে কী কইরে বুইঝলেন ? পেছনেও খান দুই চোইখ আসে নিকি ?
— ধূর, চোখ থাকতে যাবে কেন! বেশ কয়েকদিন আপনাদের নাম ঘোষণা হচ্ছে, শুনছি। আজই তো কলেজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ?
— কাজের উনেক চাইপ, বুইঝলেন কিনা। এত কুরে বইললো। না কইরতে আর পাইরলম্নি। বুইঝলেন কিনা...
— যাই ?
— আইসেন। পাইরলে ওনুষ্ঠানটায় থাইকেন। আমিই ভ্রিত্তিপস্তর স্থাইপন...
— অবশ্যই...অবশ্যই...
শিক্ষানুরাগীবাবুর থেকে লোকটি ক্রমশ দূরে সরে যেতে থাকে। অপ্রত্যাশিত ধাক্কায়, শিক্ষানুরাগীবাবু যে চটেছে , সে বিষয়ে লোকটি নিশ্চিত। কথা বলছিল যখন, ভেতরের রাগ, উচ্চারিত শব্দগুলির সঙ্গে অতিরিক্ত আ-কার, এ-কার, ই-কার, উ-কার রূপে বের হয়ে আসছিল, লোকটি দেখছিল। এইভাবেই এরা ভেতরের রাগকে প্রশমিত করে , কিংবা জমিয়ে রাখে। সমাজসেবীবাবু, যার টিচার্স ট্রেনিং কলেজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন আজ, আর এই শিক্ষানুরাগীবাবু দুজনে মিলেই মূলত পার্টিটাকে ধরে রেখেছে এ অঞ্চলে। পার্টিতেও এ দুজনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠে না। আরও একজন আছে, পরিবেশবান্ধববাবু। তার কথা যথাসময়ে কথার ভিতর থেকেই উঠে আসবে। এই অঞ্চল, বা পাশাপাশি অঞ্চলে যাবতীয় উদ্বোধন বা ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনে, এদের ডাক পড়ে। বড় বড় মার্বেলের প্লেটে এদের নাম খোদাই করা হয়। নামগুলি মনে থাকে না লোকটির। শুধু নামের পাশে বন্ধনী দিয়ে লেখা থাকে, শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ব, বা সমাজসেবী, বা পরিবেশবান্ধব। সেগুলি-ই মনে থাকে লোকটির। লোকটি কিছুটা দ্রুতই পেছন দিকে ছুটে যেতে থাকে। ভেতরে তার চিনচিন করে ওঠে সেই হাড়বজ্জাত। সে টের পায়। করুণাময়ী পান স্টলের ওপরে লেখা থাকে, এখানে মিঠাপাতা পাওয়া যায়। কেন এটি শুধু শুধু লেখা আছে, কেউ জানতে চায়নি কোনোদিন। লেখা থাকে। মানুষের উদাসীনতা মানুষকে প্রশ্নহীন বাঁচতে শেখায়। ভিতরে, যখন চিনচিন করে ওঠে সেই হাড়বজ্জাত, লোকটি লক্ষ করে মাথার ওপর ঝাঁক ঝাঁক পাখি তালগোল পাকিয়ে দিয়ে কোথায় যেন উড়ে চলে যায়।
৪.
সকাল সকাল ঝাঁপ তুলে দেওয়া হয়, করুণাময়ীর। সকালের লোকালটায় দূর দূর থেকে সবজীওলারা আসে বস্তাভর্তি টাটকা শাক সবজি নিয়ে। তারপর ট্রলিতে করে যে যার জায়গাগুলিতে ছড়িয়ে যায়। আগে থেকে চট, তালাই পেতে অপেক্ষা করে বউগুলি। তাদের পুরুষগুলি ফেরার পর তারা চলে যায়, বাড়িতে বাড়িতে পালির কাজ ধরা আছে। আগের দিন সন্ধের ট্রেন ধরে পুরুষগুলি যায়। তাদের বউ ঘরেই থাকে। যে সকল পুরুষ ধকল নিতে পারে না, তাদের সব বউ সন্ধের ট্রেন ধরে। রোড চন্দ্রকোনা, গড়বেতার আনাজপট্টিগুলিতে যে যার জায়গা ঠিক করা আছে। মশারি, চাটাই, চাদর ওখানেই রাখা থাকে। কয়েক ঘন্টার ব্যাপারতো, আবার রাত থাকতে লাইন দিতে হয়। তবু এই কয়েক ঘন্টার জীবন অন্যরকম । বড়বাজারের সবজীওলার বিছানা, ধীরে ধীরে, ছোটবাজারের সবজীওলির বিছানার সঙ্গে মিলে যেতে পারে, মিলে যায়! এই নিয়ে কেউ কখনো প্রশ্ন তুলে না। সবুজ সতেজ শাকসবজীর জীবনে ঢুকে যায় তারা। শরীর রসাল হয়ে ওঠে, সেই রস চুঁইয়ে চুইঁয়ে পড়ে, ভোরবেলা শিশিরফোঁটা যেভাবে ঝরে পড়ে শাকসবজীর উদোম শরীর থেকে। এ এক অন্যরকম বেঁচে থাকা! তারপর, রাত গড়ালেই, চাষীরা ওখানে আসে। বড় বড় আড়তে দেওয়ার আগেই, চাষীদের কাছ থেকে সরাসরি মাল তুলে নেয় তারা। এতে দু’পয়সা থাকে, মালটাও সতেজ পাওয়া যায়। কিন্তু আজকের ব্যাপারটা আলাদা। কেউ কাটা পড়েছে, লাইন অবরোধ। সকালের ট্রেন এখনো ঢোকে নি। অবরোধ কখন উঠবে, কে আর বলতে পারে। ফাঁকা দেখে, করুণাময়ী পানস্টলে আসে লোকটি। তাকে দেখতে পেয়ে, ভিতরের মেয়েমানুষটি একটু এগিয়ে এসে দাঁড়ায়।
— বল, কেন ডেকেছিস ? লোকটি একপ্রকার ফিসফিস করেই জিজ্ঞেস করে।
— কিছু শুনেছিস ...
— পরিবেশবান্ধববাবু ক্ষেপে আছে। কাল রাতে লাফড়া হয়েছে।
— বলিস কি ?
— সমাজসেবীবাবু বলেছে একচুলও জমি ছাড়বে না। দরকার হলে লাশ পড়বে। কলেজ ওখানেই হবে, প্রেসটিজ কা মামলা।
— তুই কোথায় শুনলি ?
— পুরসভা অফিসের পেছনের গেটে এই নিয়ে মিটিং হয়েছে। দু’ দল ভাগ হয়ে গেছে। আর শোন, এসব কথা কারো কাছে বলতে যাস না, বিপদে পড়বি।
— আবার ঝামেলা, এরা একটু শান্তিতে বাঁচতে দিবে না রে ...
— হাড়বজ্জাত শালা ঐ শিক্ষানুরাগীবাবু। মাঝ থেকে, দু’দলকেই চটাচ্ছে। শেষে যেখান থেকে বেশী পাবে, সে দলেই ভিড়ে যাবে। শালা বাঞ্চোৎ...
— সমাজসেবীবাবু ওকে হাতে রাখতে চাইছে, বুঝতে পেরেছিস ? কাল ওকে দিয়েই ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করাল।
— ওসব সবাই বোঝে। এখন কাউকেই কাছে ঘেঁসতে দিবি না বলে দিলাম। বলবি, শরীর খারাপ করেছে ...
— হুঁ, আমার শরীর খারাপের কথা শোনার জন্য ওরা যেন বসে আছে...
— নাহলে বলবি, মা সন্তোষীর ব্রত করেছিস, এখন ওসব বারণ। নাহলে কেস খেয়ে যাবি, বলে দিলাম। সবাই খুব তেঁতে আছে। যে কোনোদিন লাশ পড়বে ...
— আমার খুব ভয় করছে, জানিস ...
লোকটি পিছু হঠতে থাকে। করুণাময়ী পান স্টল ক্রমশ দূরে সরে যায়। দূরে সরে যেতে থাকে, ভিতরের ভয়ে সন্ত্রস্ত বিবর্ণ ফ্যাকাসে মেয়েমানুষটির মুখ। লোকটি দেখেছে, সামনের কাচের বয়ামটিকে চেপে ধরেছিল মেয়েটি, যখন বলছিল তার খুব ভয় করছে। একটি অবলম্বন। মেয়েমানুষেরা একটি অবলম্বন খোঁজে। একটা নির্ভয় হওয়ার মতো অবলম্বন। আজ সেইদিক থেকেই ঝড় আসছে। ঝড়ের কারণ একটি জমি। পরিবেশবান্ধববাবু অনেকদিন ধরেই ঐ জমিতে কোল্ডস্টোরেজ গড়ার কথা ভেবে আসছে, ভিতরে ভিতরে সে রাস্তাও অনেকটা ক্লিয়ার করে ফেলেছিল। এদিকে সমাজসেবীবাবু রাতারাতি জমিটির দখল নিয়েছে। পরিবেশবান্ধববাবু মেয়েমানুষটির কাছে আসে, সবাই জানে। সমাজসেবীবাবুও ওর কাছে আসে। এখন এ দুজন কে কেন্দ্র করে দুটি দল গড়ে উঠেছে। যুযুধান দুই দলের মাঝে পড়ে, হাঁপিয়ে উঠছে মেয়েমানুষটি।
লাশ পড়ার একটি শব্দ থাকে কিনা লোকটি বুঝতে চেষ্টা করে। বাতাসে কান পাতলে, লাশ পড়বে লাশ পড়বে, এমন একটি গুঞ্জন তার কানে ভেসে আসে। সকল প্রতিষ্ঠানগুলির পেছনের দরজায় একটাই আলোচনার বিষয় এখন, লাশ পড়বে। লাশ কেমন ভাবে পড়ে লোকটি দেখেনি। দেখেনি তো কী হয়েছে, লাশ কিন্তু পড়ে। লাশ পড়ে যখন সেই পড়ারও একটি শব্দ আছে নিশ্চয়। লাশ নিঃশব্দে পড়ে না। যদিও, এমন সম্ভাবনা তৈরি হলে, চারপাশটা ক্রমে নিস্তব্ধ হয়ে ওঠে। একটি গুমট পরিবেশের সৃষ্টি হয়। মানুষেরা অন্য মানুষের মুখের দিকে তাকাতে ভয় পায়। কথা বলতে ভয় পায়। একটি পিনপতনের নিঃস্তব্ধতা। কেন এই নিঃস্তব্ধতা? একটি শব্দকে দাঁতমুখ চেপে সয়ে নেওয়ার জন্য বোধহয়! সেই শব্দটিই আসলে লাশ পড়ার শব্দ।
সকালের লোকাল, চারঘন্টা লেটে, স্টেশনে ঢুকছে। ট্রেন থেকে বিধ্বস্ত,পরিশ্রান্ত সবজীওলারা যুদ্ধফেরত পরাজিত সৈনিকের মতো যখন এসে নামছে, সতেজ সবুজ সবজিগুলি ভ্যাপসা, গুমট আবহাওয়ায় অনেকটাই নেতিয়ে পড়েছে। স্টেশনের গা ঘেঁসে গড়ে ওঠা লাইন হোটেলগুলোর থালা বাসনের শব্দে, প্রেসারকুকারের একটানা কর্কশ আওয়াজে, জমাট হয়ে থাকা গুমট পরিবেশটা কিছুটা হলেও নড়েচড়ে উঠল যেন, লোকটি টের পায়।
৫.
প্যাকেট থেকে এক একটি বেলুন বের করে লোকটি ফুলিয়ে রাখে। তিনতলা ও দু’তলার মাঝে, ঠিকভাবে বলতে গেলে, আড়াই তলার তার এই রুমটিতে, কেউ একটা তেমন আসে না। রুমের দেওয়ালময় লোকটি শাদা সবুজ লাল রঙের বেলুনগুলি টাঙিয়ে ফেলেছে। হঠাৎ করে কেউ এসে পড়লে, জন্মদিন বা অন্য কোনো উদ্যাপন ভেবে ভুল করতে পারে। যবে থেকে সে পেছন দিকে হাঁটতে শুরু করেছে, মাকে জানিয়ে দিয়েছে, ওসব চলবে না। ঘরে প্রাণী বলতে দুটি, সে আর তার মা। দাদা বৌদি, চাকুরীসূত্রে, বাড়ির বাইরে। তাদের একটিই মেয়ে, ছোট সংসার, সুখী সংসার । সকাল থেকে বারবার ফোনে, সাবধানবাণী, তোমরা কেউ বাড়ির বাইরে বেরুবে না। ভাইকে সন্ধের আগে বাড়ি ফিরতে বলে দিও, ইত্যাদি। টেলিফোনের তার বেয়ে, এপাশের লাশ পড়ার নিঃস্তব্ধতা ওপাশে পৌঁছে গেছে। তারপর থেকে, মাঝেমাঝেই রিংটোনের শব্দে এই ঘরের শুধু কেন, যেন গোটা এলাকার নৈঃশব্দ্য খানখান হয়ে ভেঙে পড়ছে। চরম এক নৈঃশব্দ্য। যেন পাতালের মধ্যে ঢুকে গিয়ে গোটা এলাকাটি, একটি শব্দের অপেক্ষা করছে, লাশ পড়ার শব্দ। লোকটি এটি আর নিতে পারছিল না। এক প্যাকেট ভর্তি বেলুন কিনে এনেছে সে, সকালবেলা করুণাময়ী থেকে ফেরার পথে। যদিও তার আবার ভয় কীসের! কোনো দলই তার চাঁদা কাটেনা। মিটিং-এ মিছিলে ডাকেনা। সে হিসেবের বাইরের লোক। তার আবার ভয় কি ? ছোটবেলার একটি প্রিয় খেলায় আবার তাকে পেয়ে বসেছে আজ। দেওয়ালময় টাঙানো, লাল ও নীল শাদা বেলুনগুলোয় একটির পর একটিতে পিন মারছে সে। ফটফট শব্দে নিঃস্তব্ধতা ফেটে পড়ছে তার এই রুমে। মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গেরুয়া বেলুনগুলোয় সোজাসুজি উঠে দাঁড়িয়ে পড়ছে সে। নিচে শব্দ, উপরে শব্দ। মেঝেতে শব্দ, দেওয়ালে শব্দ। সে টের পাচ্ছে সেই হাড়বজ্জাতটাকে। পেটের ভিতর থেকে পাকিয়ে পাকিয়ে চিনচিন করে উপর দিকে উঠে আসছে। শাললা, কোথায় ছিলি বে এতক্ষণ ? নিজের মনেই বলে ওঠে, লোকটি। এর মাঝে, বেশ কয়েকবার ষাটোর্ধ ফ্যামিলি পেনশনার মায়ের গলা পেয়েছে, সে। বাবু, এ-ই-বা-বু-, কিসের এত শব্দ রে? লোকটি পাত্তা দেয়নি। একবার দরজা সরিয়ে শুধু মুখটি দেখিয়েছে। মা নিশ্চিন্তে নিচে নেমে গেছেন। সব ঠিক আছে তাহলে বয়স্ক মহিলা ভেবেছেন।
তার রুমটি থেকে একুশটি সিঁড়ি পেছনে উঠে এলেই, ছাদ। একুশ, এই সংখ্যাটি লোকটির মনে গেঁথে গিয়েছে যেন। লোকটি এখন ছাদে। ঘটমানতা থেকে মুক্তি চাইছে লোকটি।
— ‘তোদের পৃথিবীটা খুব গোল জানিস ?’ করুণাময়ীর মেয়েমানুষটি একদিন হঠাৎ বলেছিল, লোকটির মনে পড়ে যায় । ‘সন্ধে হলে ফিরতে পারিস, সকালে যেখান থেকে শুরু করেছিলি তোরা !’
— 'আর তোর পৃথিবীটা ?'
— 'একটা লম্বা পরিণতিহীন রাস্তার মতো । শুধু হাঁটাটুকুই আছে, পৌঁছুনোর কোনো জায়গা নেই!'
— ' আমি পেছনে হাঁটা লোক। আমার রাস্তাও সবার সঙ্গে মেলে না ...'
— 'যে যত দ্রুত এগুতে চায়, সে তত তলিয়ে যায় জানিস ? জীবন আমাকে এটাই শিখিয়েছে ! তুই তো বেঁচে গেছিস।' মেয়েমানুষটি লোকটির হাত চেপে ধরে ।
— 'হাঁটবি আমার সঙ্গে পেছনদিকে ?'
— 'না রে ! জানি কোনো পরিণতি নেই, তবু সামনে এগুনোটাই নিয়তির মতো হয়ে গেছে, পেছন ফিরতে ভয় পাই ...।'
স্মৃতি মানুষকে মুহূর্তে ভারী করে দেয়। চিলেকোঠায় সার দেওয়া পায়রার খোপ থেকে শাদা পায়রাটিকে বের করে নেয় সে। হঠাৎ কী মনে করে, কালো রঙ ঢেলে দেয় লোকটি, নিমেষে, পায়রাটির ওপর। ছোট মাথা, গলা, শরীর বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা কালো রঙ ঝরে পড়ছে ছাদের মেঝেতে। কালো রঙে ভেজা পায়রাটাকে তারপর উড়িয়ে দেয় সে। ফটফট পাখার শব্দে উড়ে যেতে থাকে, একটি ছায়ার মতো দেখতে, কালো। এখন সে আর পাখি নয়। ঘটমানতার মুক্তি হচ্ছে, স্বচক্ষে অনুভব করে, লোকটি। টের পেতে থাকে, ভেতরে পাকিয়ে পাকিয়ে ওঠা সেই হাড়বজ্জাতটিকে।
৬.
— বাবু, তোর ফোন ?
নিচ থেকে মায়ের গলা পেয়ে, লোকটি আবার অন্য এক ঘটমানতায় ঢুকে যায়। তার ফোন ? সে অবাক হয়। শেষ কবে ফোন এসেছিল তার ? মনে করতে পারে না। একতলায় মায়ের ঘরেই থাকে সেই আদ্দিকালের ডায়াল ফোন। কে ফোন করতে পারে তাকে আবার ? ভাবতে ভাবতে সিঁড়ি বেয়ে নিচের দিকে সে নামতে থাকে। ছাদটি একধাপ, দুধাপ, তিনধাপ করে করে লাফিয়ে লাফিয়ে ওপর দিকে উঠতে থাকে। রিসিভারটা তুলে নেয় লোকটি। ষাটোর্ধ ফ্যামিলি পেনশনার, অবাক হয়ে তার দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন তখন, বোঝা যায়!
— হ্যালো... ?!
— ... ... ...
— কখন ? কেন ? (গলায় উদ্বেগ)
— ... ... ...
— কিন্তু আপনি কে ?
ওপর প্রান্তে ফোন কেটে দেওয়া হয়েছে, লোকটির মুখের অভিব্যক্তিতে ধরা পড়ে। এবার একটু হাসার প্রয়োজন, লোকটি ভাবতে ভাবতে, মায়ের দিকে ফেরে।
— আমি একটু বেরুবো...
— কোথায় যাবি ? এখন বাইরে না বেরুনোই ভাল, বাবু ?
— আমার ভয় নেই , আমি হিসেবের বাইরের লোক !
— এই ভর দুপুরে, দুটো খেয়ে বেরুতে পারতিস তো ?
— সময় নেই । এসে খাব...
— দেখ্ বাবা। যা ভাল বুঝিস কর ...
লোকটি বিবর্ণ, ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া মায়ের মুখটি থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। করুণাময়ীর মেয়েমানুষটির বিবর্ণ, ফ্যাকাসে মুখটি তার মনে পড়ে যায়। একটি কাচের বয়ামকে চেপে ধরেছিল তার অসহায় হাতটি। করুণাময়ী পান স্টলকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে কারা, ফোনের অপরিচিত কন্ঠ লোকটিকে এই খবর দেয়। লোকটি দ্রুত পিছিয়ে যেতে থাকে। দুপুরের সুনসান রাস্তা। মানুষজন কেউ কোথাও নেই। কোথায় যাচ্ছে লোকটি? আপাতত পুরসভা অফিসের পেছনের দরজার কথা তার মাথায় আসে। কিন্তু তার আগে সেই মেয়েমানুষটির খোঁজ নেওয়া উচিত একবার। দ্রুত বেঁকে যায় স্টেশনের দিকে। কিছুক্ষণ পিছিয়ে গেলেই বটগাছটার কাছে পৌঁছে যাবে লোকটি। আর একটু। সকালবেলায় করুণাময়ীর সন্ত্রস্ত চোখদুটি মনে পড়ে তার। পেছনে একটি হাতের ধাক্কায়, সে দাঁড়িয়ে পড়ে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আর একটি হাত। তারপরে আরও একটি। সে কিছু বুঝতে পারে না। একসঙ্গে তিনটি হাত কেন ? সে তার পেছনদিকের ঘটমানতাটিকে ঠাহর করতে পারে না। পেছনদিক থেকে এক বিপজ্জনক বাস্তব সবসময় অনুসরণ করে, যা মানুষের দেখার ক্ষমতার বাইরে, লোকটি নিমেষে তা উপলব্ধি করতে পারে। আরও কতজন তার পেছনে আছে, এমন শক্ত কঠিন হাতের অধিকারী সে বুঝতে পারে না। সামনের দিক ফাঁকা, সে এগুতে গিয়ে দীর্ঘদিনের অনভ্যাসের ফল টের পায়, সে এগুতে পারে না। পায়ের কাছে ছড়ানো ছিটানো বটফলগুলি থেকে বুঝে নিয়েছে, সে বটগাছের কাছেই চলে এসেছে। পেছন থেকে একে একে তিনজন সামনে এসে দাঁড়ায়। এই তিনজনকেই সে চেনে। একজনের নাম ল্যাংড়া, একজন হাতকাটা, আর একজন এ বাজারে নতুন। এখনো নাম অর্জন করতে পারেনি সে। কোনো না কোনো পেছনের দরজায় এই তিনজনের সঙ্গেই তার দেখা হয়েছে। তিনজনের হাতেই ধারালো অস্ত্র। লোকটি কিছু বুঝতে পারেনা। কোনো ভুল হচ্ছে না তো ?
— তোমরা ?
করুণাময়ী পান স্টল গুঁড়িয়ে দেওয়ার গল্পটি হয়তো মিথ্যা, একটি ফাঁদ আসলে, লোকটি ধরতে পারে। তার বাড়িতে ফোন এদেরই কেউ করেছিল, সে নিশ্চিত হয়। অনেকদিন পরে, বটগাছের তলে ফিরে এসে, ঘটমানতার থেকে সে একটু বিশ্রাম নিতে চায়। দু’পায়ের ওপর ভর দিয়েইবসে পড়ে, লোকটি।
প্রথমজন: মিনসিপ্যালিটির পেছলির গেটে কেন গেছলি, মাদারচোদ ?
লোকটি উঠে দাঁড়ায়। ঘটমানতার অভিমুখ অন্যদিকে ঘুরে যেতে চাইলেও, নতুন কিছুই ঘটছে না, সে ভালভাবেই টের পায়। ধারালো অস্ত্র বেয়ে ছুটে আসা প্রশ্নটি বা এই ধরনের প্রশ্নগুলি কোনো উত্তরের জন্য অপেক্ষা করে না। কোনো উত্তরকেই বিশ্বাস করে না কোনোকালে। একটু পরেই কী ঘটতে চলেছে, লোকটির বুঝতে আর বাকী থাকে না। সে বসে পড়ে, একটি ঘটমানতার সঙ্গে, হয়তো বা শেষবারের মতো যুঝে উঠতে চায় লোকটি।
দ্বিতীয়জন: শাললা ঐ বাঁড়া শিক্ষানুরাগীর সঙ্গে কী এত গুজুরপুটুর কচ্ছিলি বে, বাঞ্চোৎ ?
সে আবার উঠে দাঁড়ায়। ভিতর থেকে চিনচিন করে ওঠা সেই হাড়হারামিটাকে আর টের পায় না, লোকটি, এতদিন পর।
তৃতীয়জন: সকালে করুণাময়ীর মাগিটার কাছে কেন গেছ্লি, খানকির বাচ্চা ?
লোকটি বসে পড়তে যায়, তৃতীয়জন, এদের মধ্যে সেই নতুন লাইনে আসা অস্ত্রধারী, লোকটির কলার ধরে টেনে হিঁচড়ে দাঁড় করিয়ে দেয়। একজন চিৎকার করে বলে, শালা মাজাকি হচ্ছে? কে বলল এই কথাটা লোকটি বুঝে উঠতে পারে না। কিন্তু সেই হাড়হারামিটাকে আর ঠাহর করতে পারছে না সে, এটা স্পষ্ট বুঝে যায়। সামনের তিন তিনটি উদ্যত ধারালো অস্ত্র দেখে, এটিও বুঝতে পারে লোকটি, লাশ একটা পড়বে। লাশ পড়ার শব্দ কেমন, জানার জন্য সে হয়তো তখন আর থাকবে না। আর এতদিন ধরে হাসি চেপে রাখতে রাখতে সে আসলে অপেক্ষা করছিল একবার সজোর হাসিতে, ভয়ংকর হাসিতে ফেটে পড়বার জন্য। সেই মুহূর্তটির কাছে পৌঁছে গিয়েছে জেনে, ঘটমানতার বীভৎসতাটাকে দুচোখ দিয়ে দেখে নিতে নিতে, হিসেবের মধ্যে না থাকা লোকটি, কখন কেমন করে হিসেবের মধ্যে চলে এসেছে, এসব ফালতু ব্যাপারগুলি আর বোঝার চেষ্টা না করে, সজোরে হেসে ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে, ধারালো অস্ত্রধারীদের হতভম্ব হয়ে ওঠার সুযোগটুকু না দিয়েই, বটগাছের আনাচে কানাচে থেকে যাওয়া পাখিগুলি ঝটপট ঝটপট পাখার শব্দে , আরও অনেক পাখির সঙ্গে মিশে গিয়ে ঘটনার মধ্যে চলে আসতে চায়। কিন্তু ঘটনার বাইরে থাকার মতো, ঘটনার মধ্যে চলে আসাটাও অতটা সহজ বিষয় নয় আর, এমনই একটা প্রবাদ বহুদিন ধরে চালু হয়ে আছে !


No comments:
Post a Comment