বাতাসের মুখোমুখি, সাইকেলের সামনের দিকটি ঘুরিয়ে নিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়ানো। চোখ বন্ধ। তারপর ধীরে ধীরে হাওয়ার পথ ধরে সামনে এগিয়ে যাওয়া। সন্ধে নামার আগে, এভাবেই, বাড়ি।
এ সব কথা কাউকে বলার নয়, তবু, এই হাওয়া-বাতাসের জীবনটা খুব ভাল লাগে। নিজের বলতে আর কী, মানুষ যত বার্ধক্যের দিকে, আসলে সে একাকীত্বের দিকেই এগিয়ে যায় আস্তে আস্তে। সাইকেলটিকে হাতছাড়া করেননি কোনোভাবেই। চাকুরীজীবনের প্রথম দিকের সাইকেল, এটি। তখনো গ্রামের বাড়িতে। গ্রাম উজিয়ে লোকজন, নতুন সাইকেল দেখতে। সে সকল ভাবলে, এখন বিস্ময়। মাঝেমধ্যে একটু মেরামতি। প্রায় সত্তর ছুঁই ছুঁই বয়স, সাইকেলটির বয়স, হ্যাঁ-তা পঁচিশ-ত্রিশ তো হবেই। কে সওয়ার হয়নি, তাদের অনেকেই তো এখন আর বেঁচে নেই। সাইকেল নয়, আসলে স্মৃতি, এই স্মৃতির সঙ্গেই বিকেলবেলাটি কাটাতে চাওয়া।
বাতাস বয়ে গেলে এখনো চোখখানি বুজিয়ে ফেলেন। সবদিন। এ জন্যই প্রতিদিন বিকেলবেলায় বাতাস খুঁজে ফেরা। ধুলো খুঁজে ফেরা, ধুলোর ঘূর্ণি। কিন্তু শহরে ধুলো কই? সবই তো কংক্রিট। চোখ বন্ধ করে, ধুলো খুঁজছেন যেমন, আসলে ছোটবেলাটিকে খুঁজে চলা।
চৈত্র-বৈশাখের বিকেলগুলোতে ঝড়, মনে পড়ে। শাদা ধুলোর ঘূর্ণি গোল হয়ে, উপরে। আরো ছোটবেলা, ওগুলো আসলে অতৃপ্ত আত্মা, ধুলো হয়ে, বালি হয়ে ক্রমশ আকাশমুখি। গ্রামের অদূরেই শ্মশান, অশরীরীদের বাসভূমি। শাদা ধুলোর ঘূর্ণি আসলে ভূত। ভয়ে, চোখ বন্ধ। পরে বুঝেছেন, ভূত, মানুষেরই আর এক বিশেষ রূপ। সশরীরী। সেসকল ভূত তাড়াতে তাড়াতে অবশিষ্ট যে সময়, তাই জীবন।
অনেকেই আজ আর নেই, কিন্তু ছোটবেলার সেই অমলিন বাতাস এখনো রয়েছে। ধুলোটুকু ছাড়া। চোখ বুজে, সেই ধুলো খোঁজেন তিনি।
কখন বড় রাস্তাটির সামনে চলে এসেছেন, বুঝতে পারেননি। হঠাৎ গাড়ির হর্নে থমকে দাঁড়ান। আর একটু হলেই, পড়ে যাচ্ছিলেন। সাইকেলটিতে ভর দিয়ে সামলে নিলেন। পৌরসভার শববাহী গাড়ি দ্রুত বেরিয়ে যায়। গাড়ির পেছনে পেছনে সেই পরিচিত ধুলোর ঝড়!
এত ধুলো এল কোথা থেকে?

No comments:
Post a Comment