কবি : মানিক চক্রবর্তী । কবিতা ।
ব্রিজিতদি
সবুজ হাওয়াই-চটির স্ট্র্যাপে তাসের গৌরবময় চারটে প্রতীক
আঁকা থাকে ।
কোনোদিন এসব ভালো করে দেখি নি ।
অথচ হাওয়াই-চটি পায়ে বাথরুমে যাই, সামনের মাঠে ঘুরি,
ঘরের ভেতর চৌদ্দ ইঞ্চি টিভি-র সামনে বসে থাকি
হাওয়াই-চটি পায়ে ।
ইস্কাবন, রুইতন প্রভৃতি পরপর রবারের গায়ে ঢালাই হবার পর
মানুষ পরতে পেয়েছে,
আমি অতশত গৌরবের কথা জানি না ।
আমার স্ত্রীর রঙ্গীন ছবি দেয়ালে বাঁধানো থাকে,
মেয়ে হায়ার-সেকেন্ডারি পরীক্ষা দেবে বলে রাতদিন পড়া মুখস্থ করে যায় —
এদিকে বইয়ের র্যাকে আছে মেরিলিন মনরো
সোফিয়া লোরেন বা ব্রিজিত বার্দোর রঙ্গীন, দৃপ্ত সব অটোবায়োগ্রাফি—
তাঁরা সকলেই গৌরবময়ী ।
কিছু না করার থাকলে টেনে বার করি র্যাক থেকে
ওসব দিদিদের ;
চোখের সামনে রেখে প্রবল আত্মহনন করি ।
ঘড়িতে ঘন্টা বেজে যায় । আটটা,নটা, দশটা...
গৌরব, গৌরব, আমার চারপাশে
তবু কেন নিজেকে এত অসামাজিক ( ! ) মনে করছি,
ব্রিজিতদি ?
তোমার চোখ, তোমার চুলের কিছুটা, আর বাঁ-স্তনের গোলাপী বোঁটা
দেখতে পাচ্ছি কাচের আলমারি দিয়ে,
এবার কি হবে, তুমিই জানো সব ।
... কবিতা কবিতা নয় ( ১৯৮৯ ) ।
আশুর সঙ্গে দেখা
একজন আশুর সঙ্গে দেখা ।
চিড়িয়াখানার খুব কাছে
সন্ধেবেলা—
প্লিমাউথের ভেতরে আশু বারবার
বাইরের অন্ধকারে
ফর্সা মুখ বাড়াতে চাইছে—
আশুর মা বলছে,
এ আশু,
আশু—
গিড়্ গিয়া, তো ?
আশুর মার পেটের কাছে
আমার হাত ;
অন্ধকারে আশুর চুলগুলো
উড়ছে,
ওর সাদা জামা
এখন ধরে রেখেছে
আশুর মা—
রেড রোড ধরে যাবার সময়
আমি অন্ধকারে মুখ ফেরালাম
আশুর মায়ের দিকে—
শুধু চকচকে মুখখানা দেখতে পাচ্ছি,
আর বিজবিজ করছে লিপস্টিক !
মানিক ?
ফিসফিস করে ও বলল ।
পেট থেকে তুলে
হাতটা ধীরে ধীরে
আশুর মার বুকের কাছে
থামত ।
আশু হঠাৎ এসে বসল
মার কোলে—
আশু, আশু,
আঃ—
ঘুম পাচ্ছে ;
বিস্তির্ণ গড়ের মাঠে
প্রদীপের মত আলো জ্বলছে
দূরে-দূরে ;
না—
ভাবী ?
কী ?
পূজোর শাঁখ কিনবেন
বলেছিলেন—
আর কিছু নাস্তা ?
চলিয়ে ।
যে আশুর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল,
হাজার-হাজার আশু
এখনো এমন অন্ধকারে আছে—
তাই অন্তত একবার
আলোড়ন উঠুক না
প্লিমাউথেরই ভেতর থেকে ?
আশু, ঘুমিয়ো না—
আশু, শোনো—
তুমি ঘুমিয়ে পড়লে আমার কি ?
আমার বদলে একজন
অন্য ড্রাইভার এলে
দেখো,
তোমার অমন মাকে,
দু’মাসেই ঠিক
বাগবাজারের খাল বানিয়ে ছেড়ে দেবে !
... টাইম টেবিল ( ১৯৮৬ ) ।
বিধবা হাঁটছে
( শ্রিপ্রাকে মনে পড়ে )
বিধবা হাঁটছে ;
ল্যাম্পপোষ্টের আলো আর গাছের পাতায়
ছায়াসমাধির নিচে,
বিধবা দু-ঠ্যাং ছড়িয়ে যেভাবে হাঁটছে,
তার মনে নেই— কি বিপুল ঋণ,
কি বিপুল ঋণের ওপর সে হাঁটছে ;
একটা সাপ না আসা পর্যন্ত সে হেঁটে যেতে পারবে ।
পানে লাল দুটো ঠোঁটে
প্রতিটি পিকের সঙ্গে আরো ঠেলে—
দূরে সরিয়ে দিচ্ছে স্বামীকে :
কি বিপুল ঋণ, কি বিপুল ঋণের ওপর
সে হাঁটছে
দু-ঠ্যাং ছড়িয়ে,
তোমাদের দাবি না-ও মানতে পারে ।
... গামছা ও অন্যান্য কবিতা ( ১৯৮০) ।
ডালিয়া
প্রত্যেকেই যাবে দূরদেশে, প্রত্যেকে
যেতে চায় ডালিয়া দেখতে ।
আমি যেকথা বলছি, লোককে বোঝাতে পারছি ডালিয়া
সে শুধু আমার বয়সের জন্য
প্রত্যেকের নিজের বয়স এলে তাকে
ডালিয়া চিনে নিতেই হবে ।
নইলে কার উদ্দেশে সে যাবে ? কোথায় যাবে ? কি জন্যে যাবে ।
ডালিয়ার অঙ্কনশিল্পী পৃথিবীতে নেই ।
কখনো সূর্য হয়ে আছে ভবিষ্যৎদ্রষ্টা
কখনো অতিকায় নারীর পেছন পেছন এসে পড়ি
কিন্তু প্রত্যেক বছরই দেখি ফুল যাচ্ছে সাজির ভেতর—
ডালিয়ার অঙ্কনশিল্পী চিরদিন মৃত্যুকে সাজাতে ডালিয়া আঁকে ।
মৃত্যু কি রকম নীল ? তোমার ডাঁটির মতো নীল ?
আমি পেছন দিয়ে হেঁটে যাই পাছে তোমায় দেখে ফেলি ডালিয়া
উভয়েই ভুল করি, এত কান্না কেন— হাতে ডালিয়া
তোমাকেও দেবো
উদ্বোধন করতে পারবে ?
...প্রাণী ও ভিক্ষুক ( ১৯৭৮ ) ।

No comments:
Post a Comment