১৫ এপ্রিল, ২০১৯।
গুয়ান্তানামো: স্মৃতিকথা সাক্ষাৎকার কবিতা ছবি
সংকলন ভাষান্তর সম্পাদনা : স্বর্ণেন্দু সেনগুপ্ত
বইপত্তর (পরিবেশক: মনফকিরা)
১৬০/-
কিউবার ছোট্টো একটা দ্বীপ গুয়ান্তানামো বে। বাৎসরিক কিছু টাকার বিনিময়ে আমেরিকার অধীন। বেদম নিরাপত্তায় এইখানে তৈরি হয়েছে এক কারাগার। ভয়াবহ সেই কারাগারে বন্দী আছেন ভয়াবহ কিছু অপরাধী, ইসলামি সন্ত্রাসবাদী এমন কিছু খতরনাক মানুষ যাদেরকে এমনকি মার্কিন মুলুকের কারাগারেও রাখা বিপজ্জনক- এমনটাই দাবী আমেরিকার। কিন্তু বাস্তব কি এই কথার সায় দেয়? কী বলেন গুয়ান্তানামোতে যাওয়া নিরপেক্ষ মানবাধিকার সংস্থারা? কী বলেন ছাড়া পাওয়া মানুষেরা?
৯/১১র একদম পরপর আমেরিকা নেমে পড়েছিল সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছিল সেই অছিলায় আফঘানিস্তানকে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে মার্কিন প্রতাপ! এবং শত শত নিরপরাধ মানুষকে প্রমাণহীন ভাবে করা হচ্ছে বন্দী। এদের প্রায় ৭৮০ জনকে নানা সময় অপহরণ করে তুলে এনে পুরে দেওয়া হয়েছে এই নির্জন দ্বীপের সলিটারি সেলে। ৬ ফুট বাই আট ফুট খুপরিতে পুরে অকথ্য অত্যাচার করে বলিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে, এরাই আদতে সন্ত্রাসবাদী। প্রায় ৯০% ক্ষেত্রে অবশ্যই ধরা পড়েছেন ভুল মানুষ, উদবাস্তু, চাষি, চিনের আদিবাসী। একটাই মিল: এরা সবাই মুসলমান!
মার্কিন সেনার হাতে কখনো এদের তুলে দিয়েছে পাকিস্তান রাষ্ট্র, কখনো বা মার্কিন সেনা সন্দেহের বশে, ভুল তথ্য ও অনুসন্ধানের ফলে ভুল মানুষকে ধরেছে। তারপরে বছরের পর বছর বিনা বিচারে, তীব্র অত্যাচার ও সন্ত্রাসের মধ্যে তাদের ঠাঁই হয়েছে গুয়ান্তানামোর একটা খুপরিতে! গুয়ান্তানামো যেন প্রায় রূপকথার সেই দ্বীপের মতন যেখানে দৈত্য লুকিয়ে রাখে নিরীহ মানুষকে।
এদের অধিকাংশই নিরীহ মানুষ। সন্ত্রাসের স-ও জানেন না, কী করতে হবে তাও বোঝেন না। কেউ আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন, কেউ আরও গোঁড়া হয়ে শেষে ইসলামি সন্ত্রাসের সমর্থক হয়েছেন, কেউ আরও তীব্র ভাবে কোরান ও ঈশ্বরের শরণাগত হয়ে বাস্তব থেকে পালাতে চেয়েছেন। কেউ কেউ বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়াতে চেয়েছেন শিল্পের পথ ধরে প্রতিবাদ করে। কবিতা লিখে, ছবি এঁকে, হাতের কাজ করে। এই বইতে স্বর্ণেন্দু তুলে এনেছেন এই শেষ অংশের মানুষদের কথা, তাঁদের কাজের কথা।
বন্দীদশায় এঁরা অনেকেই কাটিয়েছেন ৫-৬-৭ এমনকি ১০-১৫ বছরও। কেউ তখন জানতেন না ভবিষ্যৎ কী! পাগল না হয়ে, আত্মহত্যা না করেও এঁরা বাঁচতে চেয়েছেন এইভাবেই। মুক্তির পর নানা রকমের কাজে, কেউ কেউ বন্দীদের সুবিচারের জন্য কেউ বা সংস্থা খুলে ফেরত আসা বন্দীদের নতুন জীবনের জন্য লড়ে যাচ্ছেন আজও।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের ইতিহাসে খুব ঘৃণ্য এবং অন্ধকার জায়গায় থাকবে গুয়ান্তানামো নিয়ে মার্কিন সরকারের নীতি। এবং সৎ মানুষের বেঁচে থাকতে চাওয়ার অপার রহস্যভরা আকুতিরও একটা সেরা নমুনাশালা হয়ে উঠতে পারে এই স্মৃতিকথা এবং কবিতাগুলো। হয়তো স্বর্ণেন্দু নিজে কবি বলেই এগুলো বাংলায় এমন একটা সুঠাম অবয়ব পেয়েছে!
এই নরকবাসের পরেও অনেক বন্দী মেনে নিয়েছেন যে বহু মার্কিন কারারক্ষী আসলে মানুষ ভালো। ক্ষমা চেয়ে, ওপরওয়ালার নির্দেশের নাম করে তারা কাজ সারতেন হয়তো বা লজ্জিত হয়েই। ফিরতি হিংসা এবং ইসলামি সন্ত্রাসবাদের পথে গিয়ে বদলাকে বেছে না নিয়ে এই যে ভাবনাগুলো, তাকে বলতেই হয় একটা সাহসী আলোর পথ। শিল্প হয়তো এই পথটারই নিশান দেয়।
শিল্পের সেই রূপকেই চিনিয়েছেন এই বন্দীরা, চিনিয়েছেন স্বর্ণেন্দু এবং চিনিয়েছেন ভূমিকা লেখক শুভেন্দু দাশগুপ্ত। শেষের দু'জনের আলাদা পরিচয় পাঠকমহলে নিষ্প্রয়োজন। প্রাক্তন/এখনও বন্দী লেখক ও কবিদেরও সুপরিচয় আছে বইতে।
সব মিলিয়ে এই বই এক উজ্জীবনের পাঠ। মানুষের মানবিকতা ও দানবিকতার পাঠ। বন্ধুরা পড়ুন অবশ্যই।
No comments:
Post a Comment