কে ব ল ই দৃ শ্যে র জ ন্ম হ য়।

কে ব ল ই  দৃ শ্যে র  জ ন্ম  হ য়।
বিশ্রাম।

জয়ন্ত ঘোষাল।

২৯ জানুয়ারি,২০১৯।

এই বইটার অনুবাদ করা কবিতাগুলো ,ছবি ও কয়েদিদের বক্তব্যগুলো যখন বারবার ঘুরে ঘুরে আসছিল, তখন একটা সমস্য তৈরী করছিল, সমস্যটা এই নয় যে বইটা পড়ব কিনা । সমস্য এটা নিয়ে ঘনীভূত হচ্ছিল যা বইটা পড়ে ফেলা অবধি, এবং পড়ার পরেও থাকতে পারে, সেটা হল বইটা কীভাবে পড়ব।

এই সংকলনে অনুবাদ হয়েছে যে কবিতাগুলো তার কয়েকটা আগে পড়া, আর সেগুলো স্বর্ণেন্দু সেনগুপ্ত কিভাবে বাংলায় অনুবাদ করেছে সেটা পড়ার আগ্রহ একজন নিছক পাঠক হিসেবেই আছে। যদিও এটুকু বললে ও খেপে যেতে পারে, আর এত বছরের সম্পর্কের কারণে অভিমান করে ছেলেমানুষী গোসাও করতে পারে। সেটা করার অধিকার ওর আছে। মাসখানেক আগে ওকে ফোন করেছিলাম, আসলে এই সমস্যার যায়গাটা থেকে যেটা একটু জটিল হল স্বর্নেন্দুর এই লেখাটা থেকে।

জেল হল ক্ষমতার সবচেয়ে বালখিল্য ভিসিবল মুখ। এই কবিতাগুলো বা কয়েদিদের কথাগুলো পড়তে পড়তে আমি অনুবাদকের, এই কাজটা করার ও ভাবনার ডিসকোর্সের পাশাপাশি ফুকোর সঙ্গে দেল্যুজের সাক্ষাৎকারটা আবার পড়তে বসলাম । কারন সমস্যাটা পাঠক হিসেবে আমার।

ফুকো : এই গল্পের সবচে স্ট্রাইকিং বিষয় ক্ষমতার শিশুসুলভ ব্যবহারটা না, বরং ক্ষমতারে যে ক্ষমতা হিসাবে ব্যবহার করা হইলো সেই হতাশা, সেইটার সবচেয়ে আদিম, ছ্যাবলা, বাচ্চামি’র ব্যাপারটা। একটা বাচ্চা হিসাবে আমরা বুঝতে পারি, রুটি আর পানি কমায়া দেয়া কী বোঝায়। জেলখানা হইতেছে একমাত্র জায়গা, যেইখানে ক্ষমতা তার নগ্ন রূপটাকে প্রকাশ করে, সবচেয়ে অপরিমিতভাবে করে আর যেইখানে এইটারে জাস্টিফাই করা হয় একটা মোর‌্যাল শক্তি হিসাবে। “আমার অধিকার আছে তোমাকে শাস্তি দেওয়ার কারণ তুমি জান যে, কাউকে খুন করা বা ডাকাতি করা অপরাধ…” জেলখানার ব্যাপারে সবচেয়ে মজার বিষয়টা হইতেছে যে, একবারের লাইগাও, ক্ষমতা এখানে নিজেরে আড়াল করে না বা কোনো মুখোশ পড়ে না; সবচে ছোটখাট ডিটেইলেও ক্ষমতা নিজেরে জাহির করে; এইটা সিনিক্যাল আবার একই সময়ে শুদ্ধ আর পুরাপুরি “জাস্টিফাইড”, কারণ এর প্রাকটিসটা পুরাপুরিভাবে নৈতিকতার ঘোরটোপের মধ্যে ফর্মুলেট করা। এর নিষ্ঠুর নিপীড়নরে বারবার দেখানো হয় খারাপের উপর ভালো’র আর বিশৃঙ্খলার উপর শৃঙ্খলার শান্ত একটা বিজয় হিসাবে।

(বাংলা অনুবাদ করেছেন ইমরুল হাসান , ভেবেছিলাম পশ্চিমবঙ্গীয় ভাষায় একটু চেঞ্জ করা যায় কিনা, কিন্তু আমার ওপারের টান যায় নি এখনো, একই বিষয়ে একই ভাষায় অনুবাদের কত যে ফর্মেশন হতে পারে!)

দেল্যুজ : হ্যাঁ, আর উল্টাটাও সমানভাবে সত্যি। শুধুমাত্র কয়েদীদেরকেই বাচ্চা হিসাবে দেখা হয় না, আবার বাচ্চাদেরকেও কয়েদী হিসাবে দেখা হয়। শিশুদেরকে একটা অপ্রাপ্তবয়স্কতার মধ্যে ঢুকানো হয়, যেইটা তাদের কাছে অপরিচিত। এইটার বেসিসে অস্বীকার করার উপায় নাই যে, স্কুলগুলি জেলখানার সাথে মিলে আর কারখানাগুলি হইতেছে এর কাছাকাছি একটা ব্যাপার।

তাই গুয়ান্তানামো জেল , তাদের কয়েদিরা,এবং তাদের আটারেন্সগুলোর বাস্তবের এনটিটি কতটা কি আছে এই প্রশ্নটা মনে আসছিল, কেননা এইসব একদিন ফুরিয়ে যাবে । কিন্তু তার থেকেও এগুলোর ধারণাগত অস্তিত্ব অনেকবেশি সুদূরপ্রসারী। এক অদৃশ্য সরীসৃপ।

বছরখানেক আগে যখন ভাষালিপিতে প্যাট্রিক লেন-এর অনুবাদ করেছিল স্বর্নেন্দু, তখন থেকে আশা করছিলাম ও ওয়াসিতার পুরোটা করবে , কেননা ওর নিজের কবিতার ধাঁচাও বদলেছে, পিতার জন্ম হয়েছে ওর মধ্যে! তাই ভাবছিলাম ও ওই লেন ছেড়ে অন্য লেনে কেন গেল।

প্রতিবাদী কবিতার যে স্ট্রাকচার তার চেয়ে প্রতিবাদের , এমনকি ব্যার্থ প্রতিবাদগুলোর গুরুত্ব বেশি আমার কাছে, তবু এই সংকলনটা, মানে কয়েদিদের কবিতা ও তাঁদের নিজেদের নিয়ে বলাগুলো আমার কাছে পাঠক হিসেবে যেভাবে এসেছে সেটার গুরুত্ব সোসাল নেটওয়ার্কিং-এর লাগাতর মামুলি চালে অসাধারণ বলার কু-অভ্যাসের চেয়ে ভিন্ন।

ফুকো : আমি মনে করি না এইটা খালি সরল আইডিয়াটা যে, আরো ভালো আর ন্যায্য বিচার পাওয়ার লাইগা মানুষ জুডিশিয়াল স্টিটেম, জাজ, কোর্ট আর জেলখানা’রে ঘৃণা করে, বরং এইটা বাদে আর যে কোনকিছুর আগেই একটা সিঙ্গুলার পারসেপশন আছে যে, মানুষের দামেই সবসময় ক্ষমতা ব্যবহার করা হয়।

এইখানে একটু থামা দরকার । ওই লাইনটা যেখানে ফুকো বলছেন , মানুষের দামেই সবসময় ক্ষমতা ব্যবহার করা হয়। এটা আমরা অনুব্রত মন্ডলের ভোকাবুলারি থেকে ট্রাম্পের মেগালোমেনিয়া নিয়ে , বা চমস্কি যেটা বলেছেন, ট্রাম্প হচ্ছেন ক্রিমিনালি ইনসেন তত অবধি টেনে নিয়ে বুঝতে পারি। কিন্তু যখন রাষ্ট্র জেলের মুখে পাউডার মাখায় তখন কী কয়েদিদের মুখেও মাখায়? বা সংশোধানাগার নাম দিয়ে কী ঢাকতে চায়, এই যে আলিপুর জেল হোটেলের চেহারা নিয়ে দক্ষিণ শহরতলিতে নতুন বসতি গাড়লো তাতে কী প্রমান হবে?

তাই এই বইটার টেক্সট আমার কাছে যেভাবে আসছে সেটা অন্যদের অন্যরকমভাবে আসতে পারে, যিনি অনুবাদ করেছেন তিনিও অন্যকিছু ভেবে থাকতে পারেন। সমস্যাগুলোর মধ্যে কোথাও হয়ত মেলার সূত্র রয়ে গেছে। খুঁজে না পাওয়াটা আমার ব্যার্থতা। কিন্তু সোসাল নেট ওয়ার্কিং একটা নির্দিষ্ট বায়োনারিতে চলে। আমি এই পোস্ট দিলাম ওমুক ওমিক রিয়াক্ট করলো না, অমুক আমাকে ইগনোর করেছে, আর ওমুক ওমুক কত না ঝটপট চলে আসে। এই নিয়ে সামাজিকতার যে মডেলটা , যে ডোমেইনটা তৈরী হচ্ছে তাতে এক একটা নতুন নতুন জেলখানা দেখতে পাচ্ছি। এটা নিয়েও ভাববার। না ভাবলেও চলে।

No comments:

Post a Comment

কবিতা।

  কবিতা : স্বর্ণেন্দু সেনগুপ্ত । বর্ষার প্রবলনূপুরে... বর্ষার প্রবলনূপুরে এসে বসে আছে একখানি কাক, ভিজে গেছে তার এই বসে থাকাটুকু। অনেক অতীত...